-
শীর্ষেন্দু-১১
পিছনে গভীর শালবন। বর্ষা পেয়ে আগাছা জন্মেছে খুব। সেদিকে চেয়ে বললেন- যাবে ওখানে?ময়না বলল- তুমি গেলে যাবো না কেন? -এসো। বলে দিগিন হাঁটতে লাগলেন। শালবন খুবই গভীর। জ্যোৎস্না পৌছায় নি ভিতরে। স্বপ্নময় অন্ধকার। জোনাকি জ্বলছে, ঝিঁঝিঁ ডাকছে। পেচার শব্দ আসছে। পাখির ডানার শব্দ।দিগিন জঙ্গলের মধ্যে ঢুকতে লাগলেন।। পিছনে ময়না। ময়না পিছন থেকে দিগিনের একটা হাত…
-
শীর্ষেন্দু-১০
ছেলেবেলায় একটা হাবা ছেলেকে সবাই ক্ষেপাতাম। সে বড় পয়সা ভালবাসত। সবাই তাকে বলত পয়সা নিবি? অমনি সে হাত পাতে। আমি বললাম। সে হাত পাতত। পয়সা দিয়ে ফের নিয়ে নিতাম। শেষবারটা মজা করার জন্য পয়সাটা নিয়ে নিতাম, দিতাম না। সে ক্ষেপে গিয়ে বলে বেড়াত- নেম্মলটা খচ্চড়। দে”লে নে’লে, দে’লে নে’লে, ফের দে’লে, ফের নে’লে। নে’লে তো…
-
শীর্ষেন্দু-৯
দিগিন নীরবে চুরুট খেয়ে গেলেন কিছুক্ষণ। অন্যমনস্ক। একটা শ্বাস ফেলে বললেন-মানুষ জন্মায় কেন ফকির সাহেব? – খোদায় মালুম। ফকির সাহেব উদাস উত্তর দেন। পানটা মজে এসেছে। নিমীলিত চোখে সেই স্বাদটা উপভোগ করতে করতে আস্তে করে বলেন- কৌন জানে। পয়দা বেফয়দা। তব ভি কুছ হ্যায় জরুর। -ভুল সত্য
-
শীর্ষেন্দু-৮
বড় অদ্ভুত বাড়ি। সারাদিনেও একটা কিছু পড়ে না, ভাঙে না, দুধ উথলে পড়ে না, ডাল ধরে যায় না। সুশৃঙ্খল্ভাবে সব চলে! তৃণাকে কোনো প্রয়োজনই হয় না কোথাও। একটা এলসেশিয়ান আর একটা বুলডগ বক্সার কুকুর আছে। সে দুটোরইও কোন ডাকখোঁজ নেই! কেবল শচীনের বুড়ো কাকাতুয়াটা কথা বলে পাকা পাকা। কিন্তু সে হচ্ছে শেখানো বুলি, প্রাণ নেই।…
-
শীর্ষেন্দু-০৭
একটা বছর ছয়েকের বাচ্চা প্লেনের পেছন দিকে রয়েছে, তার পরিষ্কার কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম, পরিষ্কার ইতলিয়ান ভাষায় সে তার মাকে জিজ্ঞেস করছে- মরে গেলে আমাদের কি রোমে ফিরতে দেরি হবে? -জীবনপাত্র
-
শীর্ষেন্দু-০৬
তিতু একটি ফড়িং ধরে দু’হাতে তার পাখনা ছিড়ছে। তার মুখ নির্বিকার। এই সাংঘাতিক দৃশ্য আমি এক আশ্চর্য প্রকাণ্ড জানালায় দাঁড়িয়ে দেখছিলাম।। তিতু বাগানে, খেজুরগাছের মতো, কিন্তু আরো সুন্দর এক গাছের তলায় দাঁড়িয়ে। যে ফড়িঙটার পাখনা সে ছিড়ছে সেটা একটা সুন্দর লাল ফড়িং। আমি তার মুখের নিষ্ঠুরতা দেখে চীৎকার করে বলছি- তিতু-তিতু-তোর মায়া-দয়া নেই! ও তুই…
-
শীর্ষেন্দু-০৫
বন্ধুগণ, ঐ যে দেখুন, একটা গুবরে পোকা দেওয়ালে ঠোক্কর খেয়ে চিৎ হয়ে পড়ল। যেমন বোকা স্বভাব, তেমনি বেঢপ শরীর। হাত-পা নেড়ে প্রবল চি-র-র শব্দে চিৎ হয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে, চেষ্টা করছে উপুড় হতে। ওকে লক্ষ্য করুন।। উপুড় হয়ে ও করবে কি? আবার সেই ওড়া, উড়ে উড়ে দেওয়ালে ঠোক্কর খেয়ে চিৎ হয়ে পড়ে আবার উপুড় হওয়ার চেষ্টা।…
-
শীর্ষেন্দু-০৪
মাথা থেকে সমস্ত স্মৃতি মুছে যায়, মুছে যায় স্বপ্ন। ভাষা ভুলে যাই, প্রিয়জনের মুখ মনে পড়ে না। শুধু সবিষ্ময়ে দেখি জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে একটুমাত্র শূন্যতার ব্যবধান। আলো আঁধারময় সেই শূন্যতাটুকুই মাত্র আমার জীবন। অতি তুচ্ছ তা, মূল্যহীন। সতেজ সাপটি তার বুকের শাদাটুকু তুলে দাঁড়িয়ে আছে, পথ বন্ধ, সমস্ত সঞ্চিত বিষ সে তুলে আনছে মুখে,…
-
শীর্ষেন্দু-০৩
পাঁচ নম্বর ফেরীঘাট জায়গাটা বোঘহয় ভাল নাআ। এই জায়গা মানুষের মনকে নরম করে ফেলে। চারদিকে আকাশ আর নীলাভ পাহাড়ের মায়া, রেলের মন্থর শান্টিঙ্গের শব্দ, স্টীমারের বিষণ্ণ ভোঁ ভোঁ আর সব কিছুর ভিতর দিয়ে অবিরল জলের শব্দ তুলে ব্রক্ষ্মপূত্রের বয়ে যাওয়া- এইসবের ভিতরে কি যেন রয়েছে। মন এলিয়ে পড়ে। দু’দন্ড বিশ্রাম নিতে ইচ্ছে করে। অবসোর ভোগ…
-
শীর্ষেন্দু-০২
তিনি অন্যমনস্কভাবে বললেন- ইউনিয়ন করতাম, বিড়ি বাঁধতাম, গুড় বেচতাম, কাপড়ের গাঁট ফিরি করতাম। আমার পরিবার প্রতিপালন এবং আন্দোলন-দুই-ই এই দুই হাতে করেছি। বিশ বছর প্রতিশোধের নেশা ছিল। বিশ বছর আমি বিয়ে করি নি, বিশ বছর একটি সুন্দর মেয়ে অপেক্ষা করে আছে। অপেক্ষা করতে করতে তার যৌবন কেটে গেল, ঝরে গেল রূপ, এক ঢাল চুল পাতলা…
-
শীর্ষেন্দু-০১
এই ঘিঞ্জি এলাকায় একটা ছোট কাঠের বাড়িতে পা দিয়ে দেখি, সামনের বারান্দায় একটা ময়লা তেলচিটে ইজিচেয়ারে একজন একা মানুষ আধশোয়া হয়ে আছে। হাড়-বের করা রুক্ষ চেহারা, গালে গর্ত, চোখে চশমা। অনেক লড়াইয়ের চিহ্ন তার শরীরে ফুটে আছে। কঠিন বাস্তব তার রক্তরস নিঙ্গড়ে একটা ছিবড়ে মানুষকে ফেলে রেখে গেছে। সন্ধ্যার আলো-অন্ধকারে দেখি লোকটা বড় অন্যমনস্ক, হাতে…
-
গন্তব্য
কবিকেও কোথাও না কোথাও পৌছতে হয়। একদিন ফিরে আসতে হয় পৃথিবীর মায়াবী দৃশ্যপট ছেড়ে। কত ভালবাসার হাত অবশেষে শিথিল হয়ে ঝরে পড়ে। যে সব অপরূপ উপত্যকায় কবি বিভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াতেন সেখানে সূর্যাস্তের শেষ রশ্মিমালা বর্ণ ও তেজ হারিয়ে নিভে যায়। নিঃসঙ্গ কবির মনে প্রশ্ন জাগে, আমি তবে কোথায় যাব? -আল মাহমুদ